জীবনের প্রান্ত জানালায় - সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়
জীবনের প্রান্ত জানালায়
সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়
জানালার পাশে বসে আছেন বৃদ্ধ অমূল্য রতনবাবু।সম্মুখে ব্যস্ত রাস্তা।চলমান জীবনের প্রতচ্ছবি।যৌবনের গল্প ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।সামনের বিস্তৃত মাঠটি এখন আর নেই, সেখানে এখন গগনচুম্বী ফ্ল্যাট।কাজেই মাঠের শেষ সীমানায় দিকচক্রবাল এখন আর দেখা যায় না।তবে মফস্বল শহরের পুরোনো বাড়ির এই দোতলা থেকে আকাশকে অনেকটাই দেখা যায়।সেখান থেকেই অতএব ভেসে আসে অনন্তের ভাষা।মনে হয় কি বিচিত্র এই জীবন।কত আনন্দ,কত কোলাহল স্পর্শ করতে করতে পেরিয়ে গেছে শৈশব,যৌবন ।জীবন পথের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছেন আজ।অস্তগামী সূর্য যেমন মন্দিরের চূড়ায় শেষ আলোর ঝলকানিটুকু দিয়ে যায়,ফেলে আসা জীবন যেন তেমনি ভাবে আজ ঝলকানি দিয়ে উঠছে মনে।দিনের শেষে সন্ধ্যায় মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে যেমন ভেসে আসে শেষ আরতির ঘন্টাধ্বনি,তেমনিই যেন ভেতর ভেতর বেজে উঠছে জীবন সায়াহ্নের শেষ রাগিনী।যেন বলছে -"নহে দূর,নহে বহু দূর"।
সত্যিই কি যে হয়ে গেল এই ক'টা বছরের মধ্যে।দুই মেয়ে বিয়ের পর দুই প্রান্তে চলে গেল নিজেদের সংসার সামলাতে।একজন সুদূর গুরগাঁও আরেকজন পুনে।আর সবচেয়ে বড় আঘাত ওদের মা'ই চলে গেল তাঁকে একেবারে নিঃসঙ্গ করে দু বছর আগে।কত ঝগড়ার রেশ জমা হয়ে আছে এই ঘরের আনাচে কানাচে।কত মনোমালিন্য,কত অভিমান।চ়েঁচামেচি করতো কিন্তু সংসারটা একা হাতে ধরে রেখেছিল সমচৌরস করে।সব দিকে নজর ছিল তার।এখনো মনে হয় সাত সকালে ছাদে ঝাঁট দিয়ে কারখানার ধো়ঁয়ায় ভেসে আসা ধুলো জড়ো করছে।কাপড় দিয়ে রোজ পরিষ্কার করতো প্রতিটি জানালা।আর ঐ যে নিমগাছ,ওটা তো তার হাতেরই লাগানো।বলতো বাড়ির উপর নিমগাছের ছায়া পড়া ভালো।তার পাতা থেকে সূর্যের আলো ঠিকরে আসছে জানালায়।তাতে যেন মাখানো রয়েছে সেই পুরোনো সখ্যতা।
"কাকা বাবু!" অন্নদার গলা।বড় শাসনের সুরে বলে উঠলো "কখন জল দিয়ে গেছি,এখনো ওষুধটা খান নি? আমি কিন্তু দিদিদের সব বলে দেবো এরকম করলে" ।গলার আওয়াজে মিশে আছে সেই পরিচিত সুর "আমি না থাকলে বুঝতে পারবে ঠ্যালা।কেউ এমন করেখোঁজ নিতে আসবে না"। হকচকিয়ে হাতে জলের গ্লাস তুলে নেন অমূল্য বাবু।মেয়েরা বাবাকে গচ্ছিত করে দিয়ে গেছে অন্নদার কাছে।সে আর এখন বাড়ির ঝি নয়,সর্বময় কত্রী বলা যায়।অলিখিত পাওয়ার অফ এটর্নি।ঘরের কাজ ও সামলায় রান্নাও করে।বাজার করে দেয় ওর বর।রাত্রে এসে সেই বর শুয়েও থাকে ডাইনিং এ।সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে মেয়েরা।পূজোর ছুটিতে বা অন্য সময় যখন মেয়েরা আসে সব হিসেব পত্র বুঝিয়ে দিয়ে যায়।অন্নদার উপর খুব বিশ্বাস তাদের।থাকবে নাই বা কেন? অন্নদার জন্য কি আর কম করে মেয়েরা? সারা বছরের কাপড়জামা সে পুরোনো হোক আর নতুন সব দেয়,ওর বরের জন্য টোটো কিনে দিয়েছে আর বেকার ছেলের জন্য বস্তিতে গোলদারি দোকানের মূলধন জোগাড় করে দিয়েছে।সে জানে এখানেই তাকে কোনরকম করে কর্মে খেতে হবে বাকি জীবনটা।দুনিয়া বড় নিষ্ঠুর।
এমনি এক নিঃসঙ্গ দুপুরে হঠাৎ বেজে উঠলো কলিং বেল।দরজার সামনে দুজন অতিথি।একজন পুরুষ, একজন মহিলা।মানুষের মুখ দেখে আজকাল মোটামুটি আন্দাজ করতে পারে অন্নদা,কে দুষ্টবুদ্ধিসম্পন্ন আর কার মুখে সরলতার ছাপ।বললো-আসুন উপরে।অমূল্য বাবুকে দেখেই ভদ্রমহিলা বললেন-কেমন আছেন দাদা? আপনি আমাকে ঠিক চিনতে পারবেন না।আমি চন্দনা।আপনার স্ত্রী সুরমার কলেজের বন্ধু।বলতে পারেন আমার একমাত্র প্রাণের বন্ধু।ওর চলে যাওয়ার দিনে আমি এখানে ছিলাম না,তাই আসতে পারিনি।এতো চঞ্চল মেয়েটা এতো সাত তাড়াতাড়ি কি করে চলে যেতে পারে এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।তবে আপনি আমাকে না দেখলেও আমি কিন্তু আপনাদের দুজনকেই অনেকবার দেখেছি চুপিচুপি।ফুচকা খেতে দেখেছি এমনকি 'এই পথ যদি না শেষ হয়" গান গাইতেও দেখেছি।
এসব শুনে অমূল্যবাবু ছড়া কাটলেন
এক যে ছিল চন্দনা
নামখানি তার মন্দ না
হলোই বা সে বেজায় রাগি
আমার প্রাণের বন্ধু না!
ভদ্রমহিলা বললেন-সেকি! এ ছড়া তো সুরমার তৈরি, সুযোগ পেলেই যখন তখন আমাকে শোনাতো, আপনি জানলেন কি করে?
সব জানা যায় ম্যাডাম,মৃগনাভির গন্ধ লুকোনো থাকে না।আরো জানি,আপনি ডান হাতে ঘড়ি পরতে ভালো বাসতেন,কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি না তো।
-সব আনন্দ মূর্চ্ছনারই তো ইতি আছে দাদা।কিন্তু আজকে যে জিনিস আপনাকে দিতে এসেছি সেগুলি জানি আপনাকে যতো না আনন্দ দেবে তার চেয়ে বেশি দুঃখ দেবে।কিন্তু আমাকে কথা রাখতেই হবে,এ বোঝা আর কতদিন বয়ে বেড়াবো? বলে ভদ্রমহিলা একটা মোটা খাম খুলে কতগুলো পুরোনো চিঠি টেবিলের উপর রাখলেন।-সুরমা বলে গেছে আমি মারা গেলে বরকে ফেরৎ দিয়ে দিস।
অমূল্যবাবু অবাক হয়ে দেখলেন তাঁরই হাত লেখায় সুরমাদেবীকে লেখা সোনালী দিনের ভালোবাসায় মাখা সেই চিঠির অক্ষরগুলো আজও কেমন জ্বলজ্বল করছে।তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।দুহাত দিয়ে চিঠিগুলো নিজের বুকে চেপে ধরলেন।বুকের ভেতর আবেগের ঢেউ বাধা মানছিল না।ঠৌঁট গাল থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো।দুচোখে জুড়ে তখন প্লাবন।ভাবলেন "এতো যত্ন করে আমার চিঠিগুলো রেখেছিল সুরমা! এতো গর্বের ছিল এগুলো তার কাছে!"
********
লেখক পরিচিতি
Sushil Kumar Banerjee
Lower Chhinnamasta
Radhanagar Road
Muri Factory Airtel Tower
Asansol 713325

Join the conversation